প্রকৌশল পেশা অতীব প্রাচীন একটি পেশা এবং সেই সাথে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিংও বটে। বিশ্বের সব আবিস্কার, নির্মাণ এবং উন্নত সেবা পদ্ধতির উদ্ভাবন ও চালুর পেছনে বরাবর বিজ্ঞানী আর প্রকৌশলীরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এসেছে। বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমেরও প্রধান চালিকা শক্তি হল প্রকৌশলীরা। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই আজ বাংলাদেশে অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা তৈরি হয়েছে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে, বিভিন্ন প্রকারের বড় ও ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, বিভিন্ন প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক নবীন প্রকৌশল গ্র্যাজুয়েট বের হছে। ব্রিটিশ আমলে প্রকৌশল বিষয়ে কারিগরী ট্রেড কোর্সধারীরা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন। সে সময় এদেশে তথা তৎকালীন পূর্ববঙ্গে শুধুমাত্র ঢাকা সার্ভে স্কুল নামে একটি কারিগরী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল যেটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৭৬ সালে। এই স্কুলকে পরে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল করা হয় ১৯০৫ সালে। এই স্কুল থেকে ৪-বছর মেয়াদী ওভারশিয়ার কোর্স প্রদান করা হত। তখন থেকে ব্রিটিশ আমলের শেষদিক তথা পাকিস্তান আমল থেকে এদেশে তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ডিপ্লোমাধারীরা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৪৭ সালে এই স্কুলকে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে উন্নীত করা হয়। এখান থেকে সিভিল, ইলেক্ট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল- এই ৩টি বিষয়ের ওপর ৪-বছর মেয়াদী বি.এস.সি. ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী প্রদান করা হতো। তারপরই এদেশে গ্র্যাজুয়েট প্রকৌশলীদের যাত্রা শুরু হয়েছে বলা যায়। এরপর ১৯৫৫ সালে ঢাকা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখান থেকে সিভিল, ইলেক্ট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল- এই ৩টি বিষয়ের উপর ৩-বছর মেয়াদী ডিপ্লোমা কোর্স প্রদান করা হত। এই ডিপ্লোমাধারীরা তখন থেকে ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৬২ সালে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজকে উন্নীত করা হয় পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (East Pakistan University of Engineering and Technology, EPUET)। ১৯৭১ সালের ১৬-ই ডিসেম্বর আমাদের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধেম বিজয় অর্জনের পরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান এই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (Bangladesh University of Engineering and Technology, BUET) যা এখন বুয়েট (BUET) নামে বেশি পরিচিত। এরপর থেকে প্রকৌশল শিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আর পিছনে তাকিয়ে হয়নি। এরপরের ইতিহাস শুধুই সামনে এগিয়ে যাবার। এরপর প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, ও ঢাকায় চারটি ইঞ্জিনিয়ারিং ইন্সটিটিউট, এগুলোকেও ২০০৪ সালে প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করা হয়। তাছাড়া ১৯৯২ সালে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইন পাশ হওয়ার পর এখন পর্যন্ত শতাধিক বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে শত শত প্রকৌশল বিভাগ খোলা হয়েছে।

বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক প্রকৌশল বিষয় নিয়ে পড়াশুনা

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এই দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরাই প্রকৌশল শিক্ষা বিষয়ক পড়াশুনা করতে আসে। যারা আর প্রকৌশলী হওয়ার জন্য প্রকৌশল শিক্ষার কোন বিষয় নিয়ে পড়তে আসে তাদেরকে মূলতঃ এসএসসি ও এইচএসসিতে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, গণিত, উচ্চতর গণিত, ইত্যাদি বিষয়গুলো অধ্যয়ন করে আসতে হয়। এছাড়া পদার্থ ও রসায়ন বিজ্ঞানের ল্যাবরেটরি কোর্সও করতে হয়। এরপর যখন সে তার এইচএসসি শেষ করে প্রকৌশল শাখার কোন বিষয় নিয়ে পড়তে আসে তখন তাকে আরও অনেকগুলো সাধারণ বিষয় যেমন, ইংরেজী ব্যকরণ, ভাষা ও সাহিত্য; পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, সংশ্লিষ্ট ল্যাবরেটরি কোর্স; বাণিজ্য বিভাগের একাধিক বিভিন্ন বিষয় যেমন, হিসাববিজ্ঞান, অর্থনীতি, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, শিল্প ব্যবস্থাপনা, ইত্যাদি; সমাজ ও কলা বিভাগে একাধিক বিভিন্ন বিষয় যেমন, বাংলা ব্যকরণ, ভাষা ও সাহিত্য, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাস, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, ইত্যাদি; গণিতশাস্ত্রের অন্ততঃ পাঁচ-ছয়টি বিষয় যেমন, ক্যালকুলাস, ডিফারেন্সিয়াল সমীকরণ, জ্যামিতি, সরলরৈখিক বীজগণিত, পরিসংখ্যান, ভেক্টর, ফুরিয়ার ধারা, ল্যাপ্লাস ও পয়সন সমীকরণ, প্রকৌশল বিষয়ক সংখ্যাভিত্তিক গণনা পদ্ধতি ও এর মূল্যায়ন, ইত্যাদি। তবে এই কোর্সগুলো একটি প্রকৌশল শাখার কারিকুলামের মোট ক্রেডিটের ৩০-৩৫% হয়ে থাকে। এছাড়া মোট ক্রেডিটের ৫-১০% অন্য প্রকৌশল শাখার বিভিন্ন তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক বিষয়ও পড়তে হয়। তবে মোট ক্রেডিটের ৪৫-৫০% কোর্স নিজ নিজ প্রকৌশল শাখার বিভিন্ন তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক বিষয় জানতে হয়; এগুলোকে আমরা ঐ প্রকৌশল শাখার মূল বা কোর কোর্স বলে থাকি। এরপর থাকে মোট ক্রেডিটের ১২-১৫% ঐচ্ছিক বিষয় যেগুলো নিজ নিজ প্রকৌশল শাখার বিভিন্ন তত্ত্বীয় ও ব্যবহারিক বিষয় থেকেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের পছন্দমত নিয়ে থাকে। সবেশেষ বর্ষে এসে শিক্ষার্থীদের করতে হয় একটি এক বছরব্যাপী ক্যাপ্সটোন ডিজাইন প্রজেক্ট এবং সর্বশেষ সেমিস্টারে ইন্টার্নশিপ। এছাড়া অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি গবেষণা বিষয়ক কোর্স, চাকুরিজীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতাবৃদ্ধির কোর্সও শিক্ষার্থীদের করিয় থাকে। এই বিষয়গুলো অধ্যয়ন করতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের অনেক ধরনের প্রকৌশল ও কারিগরী বিষয়ক টেক্সট ও রেফারেন্স বই পড়তে হয় এবং কিছু কিছু করতে কোর্সভিত্তিক মিনি প্রজেক্ট করতে হয়। তখন তাদের অনেক গবেষণা প্রবন্ধও পড়তে হয়। অতএব বুঝা যাচ্ছে, একজন প্রকৌশল বিষয়ের শিক্ষার্থীকে শুধু বিজ্ঞান ও কারিগরী বিভাগের বিষয় সম্বন্ধে জানলেই চলে না, তাকে অন্যান্য বিভাগের বিষয় সম্বন্ধেও জানতে হয়। কিন্তু যারা প্রকৌশল বিষয়ের উপর পড়াশুনা করতে আসে তাদের অনেকেরই এইসব বিষয় সম্বন্ধে ধারণা নেই। এজন্য গতানুগতিকভাবে অনেক ভাল শিক্ষার্থীদের পক্ষেও প্রকৌশলী হয়ে উঠা সম্ভবপর হয় না; কারন প্রকৌশল বিষয় নিয়ে পড়তে এসে এসব ভিন্নধর্মী বিভাগের বিভিন্ন ধরনের কোর্স পড়ার মত ইচ্ছা বা ধৈর্য অনেকেরই থাকে না, তাই তারা সেইসব কোর্সগুলো কম গুরুত্ব দিয়ে পড়ে অথবা সেগুলোতে কম গ্রেড পেয়ে মোট সিজিপিএ নিচে নেমে যাওয়ার কারনে মাঝপথে পড়াই ছেড়ে দেয়।

On the Outcome-Based Education (OBE)

প্রকৃতপক্ষে, যে কোন বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতে হলে তার জন্য কঠোর পরিশ্রম, প্রচুর পড়াশুনা, ও সাধনার প্রয়োজন হয়। একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করলেও অন্যান্য বিষয়ের জ্ঞান কেন দরকার অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে সেই ধারনাটাই নেই। একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝানো যাক। যেমন, কোন একটি রাস্তার মধ্যে ডিভাইডার দিয়ে রাস্তা পারাপারের জন্য ফুটওভার ব্রীজ বানানো হল, কিন্তু কিছুদিন পর দেখা গেল সেটা কেউ ব্যবহার করছে না এবং জানা গেল যে সেই এলাকার মানুষদের মূল রাস্তায় আসার পর প্রায় ৫০০ মিটার হেটে ফুটওভার ব্রিজের নিকট আসতে হচ্ছে, যেটা তাদের জন্য কষ্টকর। তাই তারা রাস্তার যেখান দিয়ে গাড়ি ঘুরছে সেখান দিয়ে ঝুঁকি নিয়েই রাস্তা পারাপার করছে। এখন প্রশ্ন হল, তাহলে যেসব প্রকৌশলীরা এত কষ্ট করে সেই ব্রিজটি বানালো তারা কেন আগেই এই বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখল না? এইযে সরকারী বাজেটের অপচয় হল, বানানো স্থাপনাটি তেমন কাজেই আসল না এর দায় কার? কাজেই বুঝা যাচ্ছে, আসলে একজন প্রকৌশলী হওয়া সত্যিই একটি কঠিন কাজ। প্রকৌশলী হতে হলে তাকে সমাজ, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, সংস্কৃতি, মনস্ততঃ, মেডিক্যাল সায়েন্স, ইত্যাদি নানাবিধ বিষয় সম্পর্কে জানতে হয়। তা না হলে সে একজন ভাল প্রকৌশলী হতে পারে না। আর একটি উদাহরণ দেয়া যাক। এখন যেমন, করোনা মহামারী চলছে। এই সময় মেডিক্যালে ব্যবহৃত অনেক যন্ত্রপাতি, যেমন, ইসিজি মেশিন, পালস অক্সিমিটার মেশিন, ইনফ্রা-রেড থার্মোমিটার, ভেন্টিলেটর মেশিন, ইত্যাদি কিন্তু তড়িৎ প্রকৌশলীদের হাতেই গড়া। আজকাল বিভিন্ন অ্যাপ্স তৈরি করে পুলিশ, ডাক্তার, ফার্মাসিস্ট, সাংবাদিক, সরকারী কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষজন ব্যবহার করছে। অথচ এগুলোর মূল কৃতিত্বের দাবীদার হল আমাদের কম্পিউটার প্রকৌশলীরা। আর এজন্য সবদেশেই প্রকৌশলীদের সামাজিক অবস্থানও অন্যান্য পেশাজীবি মহল অপেক্ষা অনেক বেশি। তাই বিশ্বের অনেক দেশেই প্রকৌশলীরা নীতি-নির্ধারনী ভূমিকায়ও দায়িত্ব পালন করে থাকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই যে, আমাদের দেশে কখনো প্রকৌশলীদের সেভাবে দেখা, ভাবা বা কাজে লাগানো হয়নি। অথচ, সভ্যতার অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি কিন্তু প্রকৌশলীরাই।

What is meant to be Electrical and Electronic Engineering?

তবে এদেশে পাকিস্তান আমলেও সিএসপি অফিসারদের পাশাপাশি প্রকৌশলীদের সমস্থান ছিল এবং তাঁরা সরকার তথা সমাজের উঁচুমানের দক্ষ জনবল হিসেবে বিবেচিত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ আমলে মূলতঃ আমলাতন্ত্রের কারণে প্রকৌশল শিক্ষা ও পেশায় ছেদ পড়তে শুরু হয়। আগে যেকোন প্রকল্পের কাজের বেদীতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ও বাস্তবায়ণকারী প্রকৌশলী/দের নাম খোদাই করে রাখা হতো। কিন্তু এখন তা আর নেই। অথচ সেটা করা হলে তাদের শুধু যে কাজের স্বীকৃতিই দেয়া হত তা নয়, তাদের মধ্যে একটা দায়িত্ববোধের ব্যাপারও চলে আসত যাতে তারা সেই কাজটি ভাল করে সম্পন্ন করতে উৎসাহিত বোধ করত। কালক্রমে প্রকৌশল পেশায় নেমে আসে আরো বিভিন্ন ধরনের অধঃপতন। এখন তো প্রায় ক্ষেত্রেই প্রকৌশলীদেরকে রাজনৈতিক নেতা ও দায়িত্ববানরা কর্তৃক আদিষ্ট/নির্দেশিত হয়ে জনসাধারণের ট্যাক্সের টাকায় ফরমায়েশী কাজ/প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ণ করতে বাধ্য করা হয়, অনেকক্ষেত্রে সুপারভিশন করারও ক্ষমতা দেয়া হয় না, বরঞ্চ এসব কাজে খারাপ কিছু হলে এজন্য প্রকৌশলীদেরকেই দায়ী করা হয়/হচ্ছে।

প্রকৌশল শিক্ষার মাধ্যমেই অর্জিত জ্ঞানের দ্বারা আমাদের শিক্ষার্থীরা শিল্পক্ষেত্রে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ও মানুষের জীবন-মানের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখতে পারে। বিশ্ব যতই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে তার মূলে রয়েছে নিত্য-নতুন প্রযুক্তির উন্নত ও আধুনিক উদ্ভাবন ও এর সফল প্রয়োগ। এর ফলে বিশ্ব অনেক বেশি স্মার্ট হচ্ছে। এখন হাতের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, পরিধেয় বস্ত্র, খবরের কাগজ, মেডিক্যাল যন্ত্রপাতি সব কিছুই স্মার্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই কোন দেশকে উন্নতির ধারাবাহিকতায় ধরে রাখতে হলে শিল্পের অগ্রগতি ও সাধারণ মানুষের জীবন-মানের উন্নয়নের কোন বিকল্প নাই, তাই আমাদের দেশকে উন্নত করতে হলে প্রকৌশল শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। আর স্মার্ট দেশ, স্মার্ট শহুরে ব্যবস্থা আর স্মার্ট জনগোষ্ঠী তৈরি করতে হলে আমাদের দরকার স্মার্ট শিক্ষার্থী যারা প্রকৌশল শিক্ষা লাভ করে স্মার্ট গ্র্যাজুয়েট হবে এবং শিল্পক্ষেত্রে স্মার্ট অবদান রাখতে পারবে, যারা উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন হবে।

প্রকৌশলীরাই তৈরি করবে সবকিছুর স্মার্ট উপকরণ ও এর সমাধান। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, শিক্ষার প্রতিটি বিষয়েই আজ প্রকৌশল শিক্ষার অবদান পরিলক্ষিত হচ্ছে। যেমন, এই করোনা মাহামারীকালেই যখন অনলাইনে ক্লাশ শুরু হল তখন কী ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি, কী ব্যবসা শিক্ষা, ম্যানেজমেন্ট, কী আইন, কী মেডিক্যাল, এবং কী প্রকৌশল শিক্ষা সবারই প্রকৌশল জ্ঞানের দরকার হয়েছে। কারন সবাই কোন না কোন অনলাইন ক্লাশ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (যেমন, গুগল ক্লাশরুম, মুডল, ইত্যাদি), অনলাইন মিটিং প্ল্যাটফর্ম (যেমন, জুম, গুগল মিট, ইত্যাদি) ব্যবহার করেছেন। সেই সাথে ব্যবহার করেছেন পিসি, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন, ট্যাব, চার্জার, ব্যাটারি, বিদ্যুৎশক্তি, মেসেঞ্জার, চ্যাট সিস্টেম, এসএমএস সিস্টেম, ইত্যাদি। এগুলো ছাড়া কী কিছু করা সম্ভব ছিল? কিন্তু এগুলো সবই প্রকৌশল শিক্ষার অবদান।

বর্তমানে প্রকৌশল শিক্ষার অনেক শাখা-প্রশাখা আছে। যেমন, তড়িৎ ও ইলেক্ট্রনিক কৌশল, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল, পুর কৌশল, যন্ত্র কৌশল, তথ্য ও যোগাযোগ কৌশল, কেমি কৌশল, পানি সম্পদ কৌশল, নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল, শিল্প উৎপাদন কৌশল, বস্ত্র কৌশল, বায়োমেডিক্যাল প্রকৌশল, খনিজ কৌশল, ধাতব কৌশল, স্থাপত্য কৌশল, মহাকাশ কৌশল, বিমানবিজ্ঞান কৌশল, বৈমানিক প্রকৌশল, ইত্যাদি। মানব কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করতে চাইলে একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজন এর যে কোন একটি শাখা থেকে পড়াশুনা করে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করা এবং কাজের মনোভাব ও আগ্রহ তৈরি করে নেয়া। এরপর দরকার তার নিজের ক্ষেত্রে কোন একটা বিষয়ের কাজের অত্যন্ত মূল্যবান একটি ধারণা তৈরি করা। এর উপর নিজের কল্পনাশক্তি আরোপ করে ধারনাটিকে বাস্তবায়নের জন্য সেটার উপর ভিত্তি করে তত্ত্ব তৈরি করা, তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা, বাজার ব্যবস্থাপনা ও চাহিদা বুঝার চেষ্টা করা, এর কার্যকারিতা ও প্রায়োগিক দিকটা দেখা। এইসব বিষয়ে কাজ করার পর দরকার এর প্রটোটাইপ তৈরি করা। সেটা সফল হলে এরপর নিজের ধারণার বাস্তব রূপ প্রদান করা। তবে এই জন্য যে অর্থের প্রয়োজন সেটার জন্য অর্থ দরকার। সেজন্য বিভিন্ন শিল্প কারখানার সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে। তাদের যে সকল বিষয়ে সমস্যা হচ্ছে তাদের জন্য এই প্রটোটাইপ কাজে লাগবে কি-না তা ভেবে দেখা যেতে পারে। তাই প্রকৌশল শিক্ষার্থীদের দেখতে হবে তাদের প্রকৌশল ধারণা দেশে-বিদেশে কোন সমস্যার সমাধানে কাজে আসবে কি-না।

প্রকৌশল শিক্ষা বরাবরই মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের বেশি টানে। ছাত্ররা যত সহজে পদার্থবিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত, কিংবা রসায়নবিজ্ঞানের মত কঠিন বিষয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয় ছাত্রীরা ততটা হয় না। কিন্তু এইসব বিষয় হল প্রকৌশল শিক্ষার মূল ভিত্তি। আর তাই প্রকৌশলের কোন শাখার বিষয় নিয়ে পড়ার আগ্রহ ছেলেদেরই বেশি থাকে। আর তাই সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে যে পদার্থবিজ্ঞান কিংবা রসায়নবিজ্ঞানের নোবেল প্রাইজ পুরুষরাই বেশি জিতে নিচ্ছে। যে কোন প্রতিযোগিতামূলক প্রকৌশল কর্মক্ষেত্রে নারীর তুলনায় পুরুষেরাই বেশি এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ইদানিং খুব কম ক্ষেত্রেই একজন প্রকৌশলী তাঁর বিবেক ও বুদ্ধিমতে কোন উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রনয়ণ, ডিজাইন করা, প্রাক্কলন তৈরী, টেন্ডার প্রক্রিয়া পালন বা ঠিকাদার নির্বাচনের সুযোগ পান। সব কিছুতেই উপরমহল থেকে আসা হুকুম অর্থাৎ প্রশাসন, আমলা, বা রাজনীতিবিদরা যা চায় তা-ই তাদের করে দিতে হয়; অন্যভাবে বললে, পুরোপুরি ফরমায়েশী কাজের বাস্তবায়ণ চলছে, আর কাজের কোন ভুল হলে তথা দোষ দেয়ার বেলায় পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকৌশলীরাই দায়ী! প্রতিনিয়ত পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়, এখানে-ওখানে প্রকৌশলীরা বিভিন্ন নেতা বা তাঁদের অধীনস্তদের নিকট নাজেহাল হচ্ছে, নির্যাতিত হচ্ছে, মার খাচ্ছে, চাকুরীচ্যুত হচ্ছে, এমনকি হত্যার শিকার পর্যন্ত হচ্ছে। উপর মহলে অন্যায় আবদার মেনে নেয়নি কিংবা কোন ঘুষ নেয়নি এজন্য বেশ কিছু প্রকৌশলীদেরকে প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে এইরকম নজীরও এদেশে সৃষ্টি হচ্ছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শহরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নের পেছনে শত শত প্রকৌশলী নিরলস ভাবে কাজ করে চলেছে এবং চেষ্টা করছে সমগ্র বিশ্বের মানুষকে স্বাভাবিক ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন উপহার দেয়ার জন্য। যেমন, কোন শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখার জন্য বিদ্যুৎ প্রকৌশলীরা দিনে চব্বিশ ঘন্টা এবং সপ্তাহে সাতদিনই কাজ করেন। কোন স্থানে কোন সমস্যা দেখা দিলে, বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে সাথে সাথে তারা সেখানে চলে যান সেই ত্রুটি খুঁজে বের করে দ্রুত সারিয়ে তুলেন, এমন কি সেটা যদি ঘটে গভীর রাতে। আবার ধরা যাক, কোন স্থানে নদীর উপর ব্রিজ নির্মান করা হবে। সেখানে পুর কৌশলীরা বিভিন্ন শিফটে কাজ করেন, নদীর প্রবল স্রোত উপেক্ষা করেই তাদের এই কর্ম সম্পাদন করতে হয়। যেসব প্রকৌশলীরা টেলিযোগাযোগ বা ইন্টারনেট সেবা প্রদান খাতে কাজ করেন তাঁদেরও কিন্তু সর্বদা সজাগ থাকতে হয়, সমস্যা হলেই তাদের সেই সমস্যার দ্রুত ও তাৎক্ষণিক সমাধান বের করতে হয়। নতুন প্রযুক্তি বাজারে আসলে তাদের সেটা সাথে শিখে নিতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, টেলি যোগাযোগ খাতের কথাই ধরা যাক; বিগত তিনটি দশকে এই খাতের প্রযুক্তির বিকাশ ও উৎকর্ষ ঘটেছে সবচেয়ে বেশি- সিডিএমএ প্রযুক্তি থেকে জিএসএম প্রযুক্তি, তারপর ১জি, ২জি, ৩জি, ৪জি, এখন আসছে ৫জি। প্রতিনিয়তই তাঁদের শিখতে হচ্ছে নতুন নতুন প্রযুক্তি। আবার কম্পিউটার প্রকৌশল খাতের কথাই ধরা যাক; সেই ১৯৭১ সালে আবিষ্কৃত ৪০০৪ মাইক্রোপ্রসেসর উন্নত হতে হতে ৮০৮৫, ৮০৮৬, ৮০১৮৬, ৮০২৮৬, ৮০৩৮৬, পেন্টিয়াম ১, ২, ৩, ৪, ডুয়াল কোর, কোয়াড কোর, কোরআই৩, ৫, ৭, ইত্যাদি কত ধরনের মাইক্রোপ্রসেসর আসল, আর এসবের কারনে সফটওয়্যারেও আসল কত পরিবর্তন, হার্ডডিস্ক ও মেমরির ধারণক্ষমতা বেড়ে মেগাবাইট থেকে গিগাবাইট, টেরাবাইট, পেটাবাইট লেভেল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। এদিকে সফটয়্যার প্রকৌশলীদের কথা চিন্তা করলে তাদেরতো প্রতি বছরই নতুন নতুন সফটওয়্যারের মুখোমুখ হতে হয়। আশির দশকে ছিল বেসিক, ভিজুয়্যাল বেসিক, তারপর আসল ফোরট্রান, তারপর সি/সি++, এরপর ম্যাটল্যাব, পাইথন আরও কত কী; এক প্ল্যাটফর্মে কোড তৈরির কাজ শিখে শেষ না করতে করতেই আর এক প্ল্যাটফর্ম সামনে এসে দাঁড়ায়।

আর এইসব পরিবর্তনের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে আর পেশাগত জীবনে বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মোকাবিলা করতে গিয়ে প্রতিটা মূহুর্ত‍ একজন প্রকৌশলীকে অনেক চাপ সামলিয়ে চলতে হয়। যেমন, কোন প্রজেক্টে কী কাজ হচ্ছে, মালামাল ঠিকমত প্রকল্প স্থানে গেল কিনা, শ্রমিকরা সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা, ডিজাইন ও এনলাইসিস ঠিকমতো হয়েছিল কিনা, মানসম্পন্ন মালামাল কেনা হয়েছে কি-না, সঠিক দামে সঠিক পণ্যটি কেনা হয়েছে কি-না, ইত্যাদি হাজারো চিন্তা। আর যাঁরা নিজের কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান চালান তাঁদের উপরতো আরো চাপ, এইসব কাজের বাইরেও তাঁদের সরকারী নানান সংস্থার সাথেও যোগাযোগ করে কাজ করতে হয়। যেমন, কোন স্থানে একটি হোটেল উঠবে। তাহলে তাদের রাজউক (যদি রাজধানীতে হয়), সিটি কর্পোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর, পূর্ত অধিদপ্তর, এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ইত্যাদি নানান ধরনের সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে এবং অনুমতি পাওয়া সাপেক্ষে কাজ করতে হয়। কত শত ঝড়-ঝঞ্জাট সামলিয়ে যে তাঁদের কাজ করতে হয়, সেটা মাঠ পর্যায়ে না গেলে বুঝা যায়-না। তারপরেও তাঁদের শুনতে হয় সমালোচনা ও গালাগালি এবং পেতে হয় বা মেনে নিতে হয় নানাবিধ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে যে, প্রকৌশল পেশায় কর্মরত কম-বেশী সবারই বয়স চল্লিশ পার হওয়ার পূর্বেই উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, মানসিক অবসাদ, হার্টের অসুখসহ নানাবিধ ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে। কিন্তু এরপরও তাঁরা কাজ করে যান শুধুমাত্র পেশাকে ভালবেসে, মানুষকে আনন্দ দিতে, মানুষের জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্য দিতে, মানুষকে নিরাপদ রাখতে আর মানুষকে নির্ভার রাখতে। আর যারা এই ধরনের চ্যালেঞ্জিং মাল্টিডিসিপ্লিনারি ফিল্ডে কাজ করতে ভালবাসে তারাই প্রকৌশল বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করতে আসেন। আমাদের উচিৎ শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পূর্বে বিষয় বাছাই করার পূর্বে তাদের এই দিকগুলো বিশদভাবে তুলে ধরা যাতে তারা পড়তে এসে হোচট না খায়, প্রকৌশল বিষয়টাকে যেন ভালবেসেই তারা এই বিষয় নিয়ে পড়াশুনা করতে আসে।

Prof. Dr. Engr. Muhibul Haque Bhuyan

লেখকঃ
অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মুহিবুল হক ভূঞা
অধ্যাপক ও প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান (মার্চ ২০১৬ – মার্চ ২০২১)
ইলেক্ট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি